বি-ভঙ্গ মাটি

ভদ্রা ও শিবসার মিলন মোহনায় কালাবিগর ঝুলন্ত পাড়া, যেখােন জীবেনর কোনো স্থির চিত্র নেই।
খুলনার দাকোেপর সুতারখালী ইউিনয়েনর ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডের এই জনপদ এখন আর কেবল
ভূগোেলর অংশ নয়, বরং ভদ্রা ও শিবসা নদীর গর্ভে হািরেয় যাওয়া এক জীবেনর ইতিহাস। এখন প্রায়
পাঁচ হাজার মানুষ লবণাক্ত জেলার ওপর ভাসমান অবস্থায় এক অন্তহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির
নির্মম পরিহাস আজ সেই ঝুলন্ত পাড়ার শেষ চিহ্নটুকুও বিলীনের পথে। নদী প্রায় সবটুকু জমি গ্রাস করে
নিয়েছে, রেখে গেছে শুধু স্মৃতি আর ভাসমান কিছু ঘর। জলবায়ু পরিবর্তনের এই রূঢ় বাস্তবতায়
কালাবগির প্রকৃতি আর মানুষের জীবন অবিচ্ছেদ বন্ধনে আবদ্ধ।
বিশেষত এই অঞ্চলের নারীদের সংগ্রাম অকল্পনীয়। যারা প্রতিদিন নদীর জোয়ার-ভাটা আর বিধ্বংসী
ঢেউয়ের সঙ্গে লড়ে চলেছে । ২০২১ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ পরবর্তী সময়ে এই জনপদ দুই ভাগে বিভক্ত
হয়ে গেলে, শুরু হয় এক চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা।
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আজ সেই হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটির খোঁজে লিপ্ত সুলতা। জলের ওপর দাঁড়িয়েই
খুঁজে ফেরে সেই আঙিনা, যেখানে একসময় ছিল গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, ছিল দুরন্ত শিশুর
ছুটে চলা, ছিল সংসারের নিশ্চিন্ত পরত। আর আজ সেই জায়গায় শুধু অথৈ জল। জরাজীর্ণ বাক্সে
অতি যত্নে আগলে রাখা আছে জমির সেই পুরনো দলিলগুলো। এই কাগজের টুকরোগুলো আজ কেবল
আইনি নথি নয়; এগুলো হারানো আশার অবশেষ। যদি কোনদিন নদী তার গর্ভ থেকে ফিরিয়ে দেয়
সেই পৈতৃক ভিটে, যদি আবার জেগে ওঠে শৈশবের সেই মাটি! এই এক চিলতে বিশ্বাসেই বেঁচে আছে
কালাবগির ঝুলান্তপাড়ার মানুষ।
বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এখানে কোনো তাত্ত্বিক বয়ান নয়, বরং নিত্যদিনের এক বিভীষিকা। যা
জীবেনর প্রতিটি পরতে দাগ কেটে রেখে গেছে। প্রতি বছর বাড়ছে জলের স্তর, নদী ভাঙনে মানচিত্র থেকে
মুছে যাচ্ছে কত বসতভিটা। এখানে ভদ্রা ও শিবসা নদীর ঢেউেয় মিশে আছে জীবেনর সুখ-দুঃখ, হাসি-
কান্না। এটি কেবল মাত্র হারিয়ে ফেলা জীবেনর চিত্র নয়, বরং প্রকৃিতর চরম বৈরিতার মুখে মানুষের টিকে
থাকার এক আখ্যান।